নারায়ণগঞ্জ  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬

টানবাজারে প্রাণঘাতী কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির আশঙ্কা

পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২১:৫১, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টানবাজারে প্রাণঘাতী কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ ট্র্যাজেডির আশঙ্কা

প্রতিটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন, গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। কিন্তু দিন, মাস গড়িয়ে বছর পার হলেও সুরাহা মেলে না কিছুরই।

ঝরে যাওয়া প্রাণগুলো আর ফিরে আসে না, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সারা জীবন বহন করতে হয় প্রিয়জন হারানোর শোক। একটু পূর্ব-সচেতনতা আর সরকারের কঠোর নজরদারি থাকলে এড়ানো সম্ভব হতো বড় বড় বিপর্যয়।

সূত্রমতে, সারাদেশে যে কয়েকটি বড় বড় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো কেমিক্যালজনিত। বিশেষ করে গত বছরের ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরে কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে তুলেছিলো।

এ ঘটনায় কমপক্ষে ১৬ জন হতাহতের খবর পাওয়া যায়। সেই ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জবাসীর মধ্যেও অনেকটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, রাজধানীর মত নারায়ণগঞ্জেও আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে কেমিক্যাল ব্যবসা।

নগরীর টানবাজার ও নিমতলী এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে ভয়াবহ চিত্র। পুরো এলাকাজুড়ে রয়েছে সুতা, তুলা ও কাপড়ের রঞ্জক কেমিক্যালের বিশাল পাইকারি বাজার। সেখানকার বহুতল ভবনগুলোর ভূগর্ভস্থ তলা ও নিচতলায় গড়ে তোলা হয়েছে কেমিক্যালের বেআইনি গুদাম। 

এসব গুদামে নাইট্রিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড, থিনার ও পাওয়ার সিলিকনের মতো অতি দাহ্য ও বিষাক্ত রাসায়নিক স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দাহ্য পদার্থের এ মৃত্যুকূপগুলোর ঠিক ওপরের তলাগুলোতেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে হাজারো সাধারণ মানুষ।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব আবাসিক ভবন থেকেই সরবরাহ করা হয় রাসায়নিক পণ্য। বাড়ির পাশেই এমন অবৈধ ও প্রাণঘাতী কর্মযজ্ঞে দিনরাত তীব্র আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসীরা।

আবাসিক এলাকায় নিয়ম না মেনে গড়ে ওঠা এসব গুদাম একেকটি জীবন্ত ডেথ-ট্র্যাপ বা মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো সমাধান মেলেনি, উল্টো কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের দাপটের মুখে তারা কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন।

তারা আরও বলেন, “প্রতিটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডির পর এসব উচ্ছেদে টনক নড়ে প্রশাসনের। কিন্তু সময় গড়ালে সবকিছু আবার ফিকে হয়ে যায়। আর কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়া না গেলে এই গোডাউনগুলোর একেকটি হবে পরবর্তী বিপর্যয়ের নাম।”

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, টানবাজার ও নিমতলি এলাকায় বিভিন্ন বহুতল ভবনের ভূগর্ভস্থ ও নিচতলায় রঙের কেমিক্যাল ও সুতার গোডাউন রয়েছে। অনেক কেমিক্যাল বা রাসায়নিক রয়েছে, যা আগুনের সংস্পর্শে এলে মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগলে সুতার সিনথেটিক বস্তুতে কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। 

এগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ বহুতল ভবনের কোনো ছাড়পত্র নেই। তাছাড়া ওই এলাকার রাস্তা সরু থাকায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। আগুন লাগলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে টানবাজারবাসীকে চড়া মূল্য দিতে হবে। 

তারা বলছেন, আবাসিক এলাকায় অনুমোদনবিহীন কেমিক্যাল গোডাউন রাখা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, এটি সরাসরি ‘গণহত্যার ঝুঁকি’ তৈরি করছে। তাই প্রচলিত আইনের সংশোধন ঘটিয়ে দণ্ড বহু গুণে বাড়ানো এবং নতুন আইন ও নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।

সম্ভাব্য এই বিপর্যয় এড়াতে অবিলম্বে আবাসিক এলাকা থেকে সব গোডাউন উচ্ছেদ করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসী।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন