শিরোনাম:
মিলন বিশ্বাস হৃদয়
প্রকাশ: ২০:৫৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:০৫, ১১ অক্টোবর ২০২৬
একসময়ে নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপূজা মানেই ছিল শহরের অলিগলিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো চোখধাঁধানো সব বিশাল তোরণ। কার চেয়ে কার তোরণটি বেশি আকর্ষনীয় ও বড় হবে এই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠতো প্রতিটি পূজা মন্ডপ কমিটি।
আমলাপাড়া, উকিলপাড়া, ডিআইটি (নয়ামাটি), নিতাইগঞ্জ, ভগবানগঞ্জ থেকে শুরু করে দেওভোগ লক্ষ্মীনারায়ণ পূজামন্ডপ সবখানেই দেখা মিলত দৃষ্টিনন্দন সব বিশাল তোরণের। হরেক রকমের কারুকাজ আর বর্ণিল লাইটিংয়ের আলোকসজ্জায় পুরো শহর রূপ নিত এক মায়াবী নগরীতে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এবং নানা প্রতিকূলতায় নারায়ণগঞ্জের সেই চিরচেনা ঐতিহ্য আজ প্রায় স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিতে চলেছে।
পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি বলতেই একসময় বোঝাতো মাসব্যাপী তোরণ নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। পূজা কমিটির আয়োজক থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তদের মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগাতো এই তোরণগুলো।
এ বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয় এক ভক্ত আক্ষেপের সুরে জানান, “আগে পূজার প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই শহরে বিশাল বিশাল তোরণ বানানোর ধুম পড়ে যেত। তোরণ দেখেই বুঝতে পারতাম, মা আসছেন। তোরণের কারণেই তখন পুরো মাসজুড়ে একটা অন্যরকম পূজা পূজা ভাব বিরাজ করত নারায়ণগঞ্জে। তখন বিশাল তোরণের লাইটিংয়ে পুরো রাস্তা আলোকিত হয়ে উঠত, যা দেখে মন জুড়িয়ে যেত। আমরা চাই, নারায়ণগঞ্জে যেন আবারও সেই ঐতিহ্য ফিরে আসে।”
আরেক ভক্ত বলেন, “গত চার-পাঁচ বছর ধরে আমরা নারায়ণগঞ্জে আর আগের মতো সেই বিশালাকৃতির তোরণ দেখতে পাচ্ছি না। এর সুনির্দিষ্ট কারণ হয়তো অনেকে বলতে পারেন না, তবে শেষের দুটি দুর্গাপূজায় ঝড়ের কবলে পড়ে উকিলপাড়ার বিশাল তোরণটি ভেঙে পড়েছিল। এরপর থেকেই শহরে বড় তোরণের দেখা মেলা ভার।”
নারায়ণগঞ্জের শারদীয় দুর্গাপূজায় তোরণ সংস্কৃতির এই ভাটার কারণ খুঁজতে কথা হয় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে।
জেলা পূজা পরিষদের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন, যার পূর্ণরূপ ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক পরিচালক প্রবীর কুমার সাহার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশালাকৃতির তোরণ নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি বিষয়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময় স্বল্পতা ও বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে এবার তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী বছর থেকে পূজামণ্ডপগুলোতে পুনরায় বড় বড় তোরণ দেখা যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তোরণ নির্মাণে অন্যকোন সমস্যা বা বাধা আছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “তোরণ নির্মাণে অন্য কোনো প্রশাসনিক বাধা বা সমস্যা না থাকলেও প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে হকারদের উপদ্রব। বিশালাকৃতির তোরণ নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত প্রশস্ত জায়গার প্রয়োজন হয়, যা ফুটপাথ বা রাস্তার আশপাশে বসা হকারদের কারণে অনেক সময় পাওয়া যায় না। এ বিষয়টিও তোরণ নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি করে।”
তবে জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন জানান, “প্রতি বছরই তোরণ তৈরি হয়, গত কয়েক বছর ধরে নানা কাজের কারণে সেই বিশালাকৃতির তোরণ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা আশাবাদী, আগামী বছর থেকে নগরবাসী আবারও সেই আগের মতো বিশাল তোরণ দেখতে পাবে।” এছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ঝড়ের কারণে তোরণ নির্মাণ কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে এই সংকটের পেছনে মূলত অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন শ্রী শ্রী বলদেব জিউর আখড়া ও মন্দিরের সভাপতি জয় কে রায় চৌধুরী বাপ্পি। তিনি বলেন, “সত্যি বলতে কি, আর্থিক সংকটের কারণেই আয়োজকরা এখন তোরণ বানানো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আগে যে তোরণ ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায় নির্মাণ করা সম্ভব হতো, বর্তমান বাজারে তার খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকারও বেশি।
কিন্তু অনেক পূজা কমিটির সম্পূর্ণ পূজার বাজেটই থাকে ৮ লাখ টাকা। এখন প্রশ্ন হলো তারা কি ঠিকঠাক পূজা পরিচালনা করবেন নাকি তোরণ বানাবেন? অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তোরণ এখন কমিটির কাছে ভয়ের কারণ বা বোঝার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আগের মতো এখন আর পর্যাপ্ত স্পন্সর পাওয়া যায় না। এছাড়া আগের দিনে বিত্তবান হিন্দু শিল্পপতিরা তোরণের পুরো খরচ স্বেচ্ছًায় বহন করতেন, যা এখন আর দেখা যায় না। স্পন্সর ও আর্থিক সহায়তার অভাব এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণেই নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপূজার এই আকর্ষণীয় তোরণ ঐতিহ্য আজ সংকটের মুখে।”
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আলোয় আলোয় চারপাশ আলোকিত করে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাওয়া। নারায়ণগঞ্জের পুরোনো বাসিন্দারা আজও ভুলতে পারেন না সেই তোরণের দিনগুলো। নগরবাসীর প্রাণের দাবি প্রশাসনের সদিচ্ছা, স্থানীয় বিত্তবানদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আবারও আলোর ঝলকানিতে ঝলমলে হয়ে উঠুক নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি পূজা মন্ডপ। ফিরিয়ে আনা হোক হারিয়ে যাওয়া সেই সোনালী ঐতিহ্য।