নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে নারায়ণগঞ্জে বিপন্ন শিল্পখাত

পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১৭:২৭, ৩০ আগস্ট ২০২৬

গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে নারায়ণগঞ্জে বিপন্ন শিল্পখাত

সকাল আটটায় কারখানায় কাজ করতে গিয়েছিলেন রোকেয়া বেগম। পঞ্চবটি বিসিক এলাকার একটি পোশাক কারখানার সামনে গিয়ে দেখেন, অনেক শ্রমিক দাঁড়িয়ে আছেন।

কিছুক্ষণ পর জানতে পারেন, গ্যাসের চাপ না থাকায় কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। রোকেয়া বেগমের মতো নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও এখন এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নিয়মিত কাজ না থাকলে আয় কমবে, আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে থাকছে চাকরি হারানোর শঙ্কা। সংসারের খরচ, ঋণের কিস্তি ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন অনেক শ্রমিক।
 
শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন কমানো হয়েছে, কোথাও শিফট কমানো হয়েছে, আবার কোথাও শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা বা ছুটি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর, মদনপুর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং ও পোশাক কারখানা। এসব কারখানার উৎপাদনব্যবস্থায় গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বয়লার ও বিভিন্ন উৎপাদনযন্ত্র চালাতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। চাপ কমে গেলে নির্ধারিত সক্ষমতায় কারখানা চালানো যায় না।
 
একটি পোশাক কারখানায় বিদেশি ক্রেতা আসার কথা রয়েছে। কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর ক্রেতারা নতুন অর্ডারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অর্ডার পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কারখানার শ্রমিক ও কর্মকর্তারা।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা না গেলে শুধু বর্তমান অর্ডার নয়, ভবিষ্যতের অর্ডারও হারানোর ঝুঁকি থাকে। ক্রেতারা তখন বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
 
নারায়ণগঞ্জের শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু ওই কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, শ্রমিক, ডাইং, টেক্সটাইল ও পোশাক তৈরির পরবর্তী ধাপগুলোও যুক্ত। ফলে একটি পর্যায়ের উৎপাদন ব্যাহত হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।

বিশেষ করে ডাইং কারখানায় উৎপাদন কমে গেলে পোশাক কারখানায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। কাপড় রং ও প্রস্তুতের কাজ সময়মতো শেষ না হলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজও পিছিয়ে যায়। এতে রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত ও জাহাজীকরণের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ–সংকটও শিল্পকারখানার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর মেশিন স্বাভাবিকভাবে চালু করতে সময় লাগে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হলেও জ্বালানি ব্যয়ের কারণে দীর্ঘ সময় উৎপাদন চালু রাখা কঠিন।
 
শিল্পকারখানার পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস–সংকটের প্রভাব পড়েছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম থাকছে। কোথাও চুলা জ্বলছে না, আবার কোথাও অল্প গ্যাসে রান্না করতে দীর্ঘ সময় লাগছে। ফলে অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। বাড়ছে পারিবারিক ব্যয়। গ্যাসের সংকটের কারণে হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও চাপ বেড়েছে। বাসাবাড়িতে রান্না করতে না পারায় অনেকে বাইরে থেকে খাবার কিনছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ও বাড়ছে।
 
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন কমবে না, এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতেও। উৎপাদন ব্যাহত হয়ে দীর্ঘদিন চললে কারখানার আর্থিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা কারখানা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তাঁদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পকারখানার জন্য সংকটকালীন বিশেষ ব্যবস্থাপনা নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট ধীরে ধীরে নারায়ণগঞ্জের শিল্প, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
 
এই বিষয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, আমাদের শিল্পকারখানার মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো গ্যাস জেনারেটরের মাধ্যমে বিদুৎ উৎপাদন করার মাধ্যমে কারখানা চালায়। তবে বেশিরভাগ কারখানায়ই ডিজেল চালিত জেনারেটর।

তাই গ্যাসের চাপ যখন বেশি কম থাকে তখন গ্যাস জেনারেটর চালিত কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যহত হয়। যা কিছু দিন আগে একটি বেশি ছিল। তবে বর্তমানে গ্যাসের চাপ অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে এসেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজেল চালিত জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালু রাখতে হয়, ফলে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ে যায়। আশাকরি এই সমস্যারও খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। তবে অনেকেই প্রপাগাণ্ডা চালায় যে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের কারণে শত শত শিল্প কারখান বন্ধ হয়ে যায় বিষয়টা তেমন না। আসলে এসব কারখানা বন্ধ হওয়া বা উৎপাদন ব্যহত হওয়ার বিষয়টা সাময়িক।
 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন