নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

শৈশবের দামে উন্নয়ন : কোন পথে বাংলাদেশ ?

রেহানা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ০০:৩৬, ১২ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০০:৩৮, ১২ জুন ২০২৬

শৈশবের দামে উন্নয়ন : কোন পথে বাংলাদেশ ?

প্রতি বছর ১২ জুন পালিত হয় “বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস”। ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) দিবসটি চালু করে। উদ্দেশ্য একটাই শিশুর হাত থেকে শ্রমের বোঝা সরিয়ে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের এই যুগে দাঁড়িয়েও কেন কোটি কোটি শিশু আজ শ্রমের কঠিন বাস্তবতায় বন্দি?

একটি শিশুর হাতে যখন বইয়ের পরিবর্তে উঠে আসে ইট, হাতুড়ি, চায়ের ট্রে কিংবা কারখানার যন্ত্রাংশ—তখন শুধু একটি শিশুর শৈশবই হারিয়ে যায় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি জাতির ভবিষ্যৎও। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো দিবস নয়,এটি মানবতা ও সভ্যতার সামনে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন।

বৈশ্বিক চিত্র : সংখ্যার ভেতরের নির্মম বাস্তবতা

ILO ও UNICEF-এর “Child Labour: Global Estimates 2024” রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, যেখানে প্রতিদিন তারা স্বাস্থ্যঝুঁকি, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় খাত এখনো কৃষি, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু কাজ করে। এছাড়া সেবা খাতে ২০ শতাংশ এবং শিল্পখাতে ১০ শতাংশ শিশু শ্রমে যুক্ত। কৃষিকাজ, খনি, নির্মাণশ্রম, ইটভাটা কিংবা কারখানার মতো বিপজ্জনক পরিবেশে এসব শিশুর বেড়ে ওঠা কার্যত এক অদৃশ্য মানবিক বিপর্যয়।

তবে আশার বিষয়ও আছে। ২০০০ সালে বিশ্বে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ কোটি ৬০ লাখ। গত দুই দশকে তা অনেক কমেছে। কিন্তু কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ু দুর্যোগ ও বৈশ্বিক দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্য আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা : উন্নয়নের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া শৈশব

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ILO পরিচালিত “Child Labour Survey 2022” অনুযায়ী দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। অর্থাৎ প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জন কোনো না কোনো শ্রমে যুক্ত।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রায় ১৩ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। তারা ওয়েল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, ট্যানারি, ইটভাটা, জাহাজ ভাঙা শিল্প কিংবা ভারী কারখানায় কাজ করছে। এসব স্থানে প্রতিনিয়ত তারা বিষাক্ত রাসায়নিক, অতিরিক্ত তাপ, ধুলাবালি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।

খাতভিত্তিক চিত্র

* কৃষিখাতে যুক্ত প্রায় ৬১% শিশু

* শিল্পখাতে ১৭%

* সেবাখাতে ২২%

ধানক্ষেত, মাছ ধরা, চা বাগান, গার্মেন্টস, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাসাবাড়ির গৃহকর্ম সবখানেই শিশুশ্রমের উপস্থিতি দৃশ্যমান। রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত এই বাস্তবতা বিস্তৃত।

লিঙ্গ বৈষম্য ও অদৃশ্য শোষণ
জরিপ অনুযায়ী ছেলে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেশি হলেও মেয়ে শিশুদের একটি বড় অংশ গৃহকর্ম, অনানুষ্ঠানিক শ্রম ও যৌন শোষণের কারণে পরিসংখ্যানে অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সরকারি তথ্যের চেয়েও গভীর হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শিক্ষার সাথে সম্পর্ক
শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুদের একটি বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষাও সম্পন্ন করতে পারে না। ঝরে পড়ার হার সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ফলে শিশুশ্রম কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবসম্পদকেও দুর্বল করে দেয়।

কেন শিশুরা শ্রমে যায় : সমস্যার গভীরে

১. দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা                                                                                        শিশুশ্রমের সবচেয়ে বড় কারণ দারিদ্র্য। যখন একটি পরিবার প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত করতেই সংগ্রাম করে,       তখন শিশুর আয়ও পরিবারের টিকে থাকার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। মাসে সামান্য কয়েক হাজার টাকার আয়ও দরিদ্র  পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২. শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
অনেক পরিবার মনে করে, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার চেয়ে তাৎক্ষণিক আয় বেশি বাস্তবসম্মত। বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত খরচ এবং শিক্ষার মান নিয়ে হতাশা শিশুকে স্কুল থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

৩. সামাজিক মানসিকতা
“ছোটবেলা থেকে কাজ শিখলে মানুষ হয়”—এই ধারণা এখনো সমাজের অনেক অংশে প্রচলিত। ফলে শিশুশ্রমকে অপরাধ নয়, বরং স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

৪. দুর্বল আইন প্রয়োগ
বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। বিপুল সংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রম পরিদর্শক খুবই কম। ফলে মনিটরিং ও জবাবদিহি কার্যকর হয় না।

৫. জলবায়ু ও সংকটের অভিঘাত
বন্যা, নদীভাঙন, মহামারী কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতি শিশুশ্রম বাড়িয়ে দেয়। পরিবার আয় হারালে শিশুরাই প্রথম শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।

সরকার ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

বাংলাদেশ ILO কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করেছে। শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচে শিশুকে কাজে নিয়োগ দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকার “বিপজ্জনক শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প” এর মাধ্যমে হাজারো শিশুকে শিক্ষা ও পুনর্বাসনের আওতায় এনেছে।

এছাড়া ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেন, ILOসহ বিভিন্ন সংস্থা কর্মজীবী শিশুদের জন্য নন-ফরমাল শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান অগ্রগতির হার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG 8.7) অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে আরও দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

করণীয়: শুধু সহানুভূতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপ

পরিবারভিত্তিক আর্থিক সহায়তা

শিশুকে স্কুলে পাঠালে দরিদ্র পরিবারকে নিয়মিত নগদ সহায়তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ খাতে জিরো টলারেন্স

ইটভাটা, ট্যানারি, জাহাজ ভাঙা শিল্পসহ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করা

কারিগরি শিক্ষা, উপবৃত্তি ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা

মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে শিশুশ্রমবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থায় জবাবদিহি

রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতে “Child Labour Free Supply Chain” নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ জরুরি।

শিশুশ্রম কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক সংকট। যে শিশুটি আজ কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, সঠিক সুযোগ পেলে সেও হতে পারত একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা দেশের দক্ষ নাগরিক।

একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার শিশুরা নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা ও স্বপ্ন দেখার অধিকার পায়। বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক কোনো শিশুর হাতে শ্রমের বোঝা নয়, ফিরিয়ে দিতে হবে বই, আলো ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।  কারণ শিশুর একমাত্র কাজ শিশু হয়ে বেড়ে ওঠা।

আরও পড়ুন