নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

পরিবারকে জিম্মি করে ফিল্মি স্টাইলে জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ

পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২২:৪২, ৪ আগস্ট ২০২৬

পরিবারকে জিম্মি করে ফিল্মি স্টাইলে জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ

সোনারগাঁয়ে এক পল্লী চিকিৎসককে ফিল্মি স্টাইলে অপহরণ, নির্যাতন এবং পরিবারকে জিম্মি করে জোরপূর্বক সম্পত্তি লিখে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। জীবন বাঁচাতে এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত সাবরেজিস্ট্রার অফিস ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী ওই চিকিৎসক।

​ভুক্তভোগী পল্লী চিকিৎসকের নাম কামাল হোসেন। তিনি উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের বরগাঁও রাজবাড়ীর সিরাজুল ইসলামের ছেলে এবং রূপগঞ্জ এলাকার বরপা এলাকায় একটি চেম্বার খুলে নিয়মিত রোগী দেখেন।

​ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলন ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, একই ইউনিয়নের বরগাঁও এলাকার মো. আশিক মিয়ার সাথে তার পূর্বপরিচিতি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। পূর্বে তাদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। গত সোমবার বিকেলে রূপগঞ্জে চেম্বারে বসা অবস্থায় আশিক মিয়া তার বাবা গুরুতর অসুস্থ জানিয়ে কামাল হোসেনকে বাইরে ডেকে নেন।

দোকান বন্ধ করে রাস্তায় বের হওয়ামাত্রই ৭-৮ জনের একটি সশস্ত্র দল তাকে জোরপূর্বক সিএনজিতে তুলে চোখ বেঁধে আড়াইহাজারের একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখে। ​সেখানে তাকে হাত, পা ও বুকে বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়। পাশাপাশি তার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে দুটি খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায় করা হয়।

ওই রাতেই সোনারগাঁ সাবরেজিস্ট্রার অফিসের নকলনবিশ মোস্তাকিমের সহযোগিতায় কমিশনের মাধ্যমে দলিল লেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে সাবরেজিস্ট্রার অফিসের লোকজনের সন্দেহ হওয়ায় সে রাতে দলিল সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

​সারারাত অমানবিক শারীরিক নির্যাতন শেষে পরদিন বিকেলে অভিযুক্ত আশিক ও তার ১০-১৫ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী জমি লিখে না দিলে পরিবারের সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কামাল হোসেনকে গাড়িতে করে সরাসরি সাবরেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে আসে। এ সময় পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে চরম আতঙ্কের মধ্যে বাধ্য হয়েই তিনি জমি লিখে দিতে বাধ্য হন।

দলিল সম্পন্নের পর সন্ত্রাসীরা তাকে পাহারা দিয়ে আবার বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায়। পরে স্থানীয় এলাকাবাসীর সহায়তায় তিনি থানায় ও সাবরেজিস্ট্রার অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন এবং সংবাদ সম্মেলন করে লোমহর্ষক এই ঘটনার বর্ণনা দেন।

​ঘটনার অন্যতম সহযোগী নকলনবিশ মোস্তাকিম দাবি করেন, আশিকের সাথে কামালের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি শুধু আড়াইহাজারে কমিশনে সাবরেজিস্ট্রারের প্রতিনিধি নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সবকিছু জেনেও একজন কর্মচারী হয়ে তিনি কীভাবে এই অপরাধে জড়িত হলেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

আরেক দলিল লেখক কবির হোসেন জানান, তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না; দলিল মোস্তাকিম লিখেছেন এবং তিনি কেবল স্বাক্ষর করেছেন। তবে জমি নিয়ে এত বড় সমস্যা রয়েছে তা তার জানা ছিল না।

​অন্যদিকে, অভিযুক্ত মো. আশিক মিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, কামালের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং তিনি সদিচ্ছায় তাদের জমি লিখে দিয়েছেন। জমির বিনিময়ে তার বাসায় বাবা-মার সামনে টাকা দেওয়া হয়েছে এবং তার ওপর কোনো জোরজুলুম করা হয়নি বলে তার দাবি।

​সোনারগাঁ সাবরেজিস্ট্রার রিয়াজুল ইসলাম জানান, ভুক্তভোগী কামাল হোসেন সশরীরে উপস্থিত হয়েই জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন। তবে পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে চিকিৎসককে শারীরিক নির্যাতন ও পরিবারকে জিম্মি করে এই জমি লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সশরীরে উপস্থিত হয়ে তার শরীরের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়েছেন। কিন্তু ততক্ষণে দলিল সম্পন্ন হয়ে যাওয়ায় তিনি কেবল নকল না দেওয়ার জন্য একটি আবেদন করেছেন। 

এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভুক্তভোগীরা চাইলে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

​এ বিষয়ে সোনারগাঁ থানায় আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগী কামাল হোসেন। 

​প্রকাশ্য দিবালোকে রেজিস্ট্রি অফিসের নাকের ডগায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের এমন জোরপূর্বক জমি লিখে নেওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দলিল রেজিস্ট্রি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের জোর দাবি, দ্রুত এই চক্রটিকে আইনের আওতায় না আনা হলে অপরাধের মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন