শিরোনাম:
পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ২৩:১৬, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিদ্ধিরগঞ্জে সঙ্গবদ্ধ চুনা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অনৈতিক কৌশলে হুমকির মুখে মানবস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র, কৃষি জমি ও ভূগর্ভস্থ পানি। চুনের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগে পৃথক ৩টি ব্যবসায়ী চক্র বেছে নিয়েছেন সর্বনাশা কৌশল।
কলকারকানার ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ (গাদ) ৩ টাকা কেজি কিনে প্রক্রিয়াজাত করে চুনের সঙ্গে মিশিয়ে ২৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। প্রকৃতি নষ্ট, বায়ূ দূষণ ও মানুষসহ জীববৈচিত্র্যের সর্বনাশ করার এ পথ বেছে নিয়ে গত দুবছরে তারা হয়ে গেছেন কোটিপতি।
ক্ষতিকর গাদ ছাড়াও চুনের সঙ্গে মিশাচ্ছেন সিরামিকের বাসনপত্র তৈরির কাওলিন মাটি। এ বিষয়ে উদাসীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিবেশের ছাড়পত্র নবায়ন না করা ও তিতাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ গ্যাস লাইন বিচ্ছিন করে দেওয়ায় দুবছর ধরে বন্ধ সিদ্ধিরগঞ্জের ১৪টি চুনা কারখানা। এ সুযোগে গড়ে উঠে তিনটি সঙ্গবদ্ধ চুন ব্যবসায়ী চক্র।
তারা বন্ধকৃত চুনা কারখানার গুদাম ভাড়া নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। জেলার সোনারগাঁ, মদনপুর ও মেঘনা এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠা চুনা কারখানা মালিকদের সঙ্গে আতাঁত করে পাথর সরবরাহ ও চুন কিনে সিদ্ধিরগঞ্জে তাদের ভাড়াকরা গুদামে এনে মজুত করেন।
পাশাপাশি ৩ টাকা কেজি দরে কিনে আনেন বিভিন্ন মিল কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া শেষে অবশিষ্ট ঘন বা আঠালো রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ (গাদ)।
এসব গাদ মানবস্বাস্থ্য এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর ও দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ক্ষতিকর গাদ শুকিয়ে এর সঙ্গে কাওলিন মাটি (পুড়ালে সাদা হয়) মিশিয়ে মেশিন দিয়ে ময়দার মত পাউডার করা হয়।
গাদ ও কাওলিন মাটি দিয়ে তৈরি পাউডার অর্ধেক আর চুনা পাউডার অর্ধেক মিশিয়ে বিক্রি করছেন ২৬ টাকা কেজি। চুনের সঙ্গে ক্ষতিকর গাদের তৈরি পাউডার মিশালেও ভোক্তারা তা বুঝতে পারছেন না। আসল চুনের চেয়ে কেজিতে ২ টাকা কম পেয়ে ভোক্তারা কিনে নিচ্ছেন ভেজাল চুন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের মক্কী নগর এলাকায় আরাফাত লাইমসের গুদাম ভাড়া নিয়ে গাদ মিশ্রিত ক্ষতিকর চুনের ব্যবসা করছেন, জামাল সরদার ও শাওন, আটি এলাকায় আশরাফ আলী লাইমসের গুদাম ভাড়া নিয়ে বাদশা, আদনান হাবীব মাসুম, মাইন উদ্দিন সরদার, আটি ছাপানা এলাকায় শাহনেওয়াজ রানার গুদাম ভাড়া নিয়ে মাসুদ, সুফিয়ান ও রমজান আলি ব্যবসা করছেন। গত দুবছরে তারা হয়ে গেছেন কোটিপতি। অথচ তারা চুনা কারখানার মালিক নন। বন্ধ চুনা কারখানা মালিকদের কাছ থেকে গুদাম ঘর ভাড়া নিয়ে তারা নিশ্চিন্তে ভেজাল চুনের ব্যবসা করছেন।
সংশ্লীষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চুনা পাউডার ব্যবহার করা হয় মাছের ঘের, পুকুর, ফিশারি ও ফসলি কৃষি জমিসহ বিভিন্ন কাজে। বিষাক্ত ক্ষতিকর গাদ মিশ্রিত চুন ব্যবহারের প্রভাব পড়ছে মানবস্বাস্থ্যে, পরিবেশ, বায়ূ, মাটি ও পানিতে। ভবন রঙ করার কাছে ব্যবহার করলে তা কিছুদিন পরই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে আসল চুনের কেজি ২৮ টাকা।
ভেজালকারীরা বিক্রি করছেন ২৬ টাকা। তবু তাদের কেজি প্রতি লাভ হয় ৯ টাকা। তথ্য মতে, ২৮ টাকা কেজিতে এক মণ চুনের দাম হয় ১ হাজার ১২০ টাকা। ভেজালকারীরা বিক্রি করে ২৬ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৪০ টাকা। তাদের মণপ্রতি আসল চুন থাকে ২০ কেজি, যার দাম ৫৬০ টাকা।
আর ২০ কেজি গাদ পাউডার তৈরি করতে তাদের খরচ পড়ে ১২০ টাকার মতো। ফলে তাদের মনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ৬৮০ টাকা। প্রতিমণে তাদের লাভ ৩৬০ টাকা, যা কেজি প্রতি হয় ৯ টাকা। দৈনিক ১০ থেকে ১৫ টন চুন বিক্রি করে তারা লাভ করছে লক্ষাধিক টাকা।
গাদ বিষয়ে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, কলকারখানার গাদে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতু যেমন- সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম থাকে। এটা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এটা মানবশরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়া তৈরি করে। এতে লিভার নষ্ট, কিডনি বিকল, ফুসফুসের ক্যান্সারসহ গুরুতর রোগব্যাধি হতে পারে। কারখানার রাসায়নিকযুক্ত গাদ সরাসরি ত্বকে লাগলে অ্যালার্জি, ঘা, চর্মরোগ এবং চোখে লাগলে অন্ধত্ব বা তীব্র জ্বালাপোড়া হতে পারে। এ গাদ মিশ্রিত চুন ফিশারি বা পুকুরে ব্যবহার করলে মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে।
ভবনের দেয়ালে লাগালে বাতাসে মিশে শ্বাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করবে। কৃষি জমিতে দিলে মাটির স্বাভাবিক পিএইচ মাত্রা নষ্ট ও উর্বরতা হ্রাস হবে। ফসল উৎপাদন কমে যাবে ও বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হবে।
এ গাদের প্রভাবে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রণী মারা যায়। গাদ মিশ্রিত পানি মাটি চুইয়ে গভীরে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দূষিত করে। ফলে টিউবওয়েলের পানিও পানের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
গাদ শুকিয়ে ধূলিকণায় পরিণত হলে তা বাতাসে মিশে বায়ূ দূুষণ হয়। মানুষের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ব্রঙ্কাইটিসের মতো জটিলতা তৈরি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিদ্ধিরগঞ্জের একজন চুনা কারখানা মালিক জানান, গ্যাস সংকটে দুবছর ধরে কারখানা বন্ধ। লাকড়ি দিয়ে চুনা পাথর পুড়ালে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি হয়। কারণ, এক ভাটি চুন পুড়াতে কমপক্ষে আড়াই হাজার মন লাকড়ি লাগবে।
এত লাকড়ির যোগান দেওয়া কঠিন। তাছাড়া লাকড়ি দিয়ে ভাটি জ্বালালে ধুঁয়ার পরিমাণ অনেক বেশি হয়। এতে পরিবেশ দূষিত হয়। গ্রাম অঞ্চল ছাড়া এত গাছের লাকড়ি সংগ্রহ করা সম্ভব না।
তিনি আরো জানান, সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত বহু অবৈধ চুনা কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় সংযোগ দেওয়া হয়েছে অবৈধ গ্যাস। সিদ্ধিরগঞ্জে গড়ে উঠা চুনা ব্যবসায়ী চক্র অবৈধভাবে গড়ে উঠা কারখানা মালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্যবসা করছে। তারা কারখানা মালিকদের কাছে পাথর সরবরাহ করছে। আবার তারাই কারখানার চুন কিনে এনে ভেজাল বানিয়ে কমদামে বিক্রি করছে।
চানতে চাইলে সিদ্ধিরগঞ্জের মক্কীনকর এলাকার আরাফাত লাইমসের সিন্ডিকেট প্রদান শাওন বলেন, এ ব্যবসা শুধু আমরা একা করছিনা আরো অনেকই করছে। চুনের মূল্য বৃদ্ধির কারণে গাদ ও কাওলিন মাটি মিশিয়ে কিছু কমে বিক্রি করছি। ক্রেতারা কোন অপত্তি করছে না। অবৈধ কারখানা থেকে চুন কিনে আনার কথা স্বীকার করলেও পাথর সরবরাহ আগে করতো এখন করেননা বলে দাবি করেন তিনি।
আটি এলাকার আশরাফ আলী লাইমসের সিন্ডিকেট প্রধান বাদশা বলেন, আমরা সরকারি ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করছি। ভেজাল চুন বিষয়ে তিনি বলেন, ক্রেতারা কমদামে চুন নিতে চায়। তাই আমরা বিভিন্ন কারখানার গাদ এনে প্রক্রিয়াজাত করে চুনের সঙ্গে মিশাচ্ছি। এসব জেনেই ক্রেতারা চুন কিনে নিচ্ছে। একই কথা বলেন, আটি ছাপাখানা এলাকার সিন্ডিকেট প্রধান মাসুদ।
জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিক বলেন, চুন ভেজাল করার বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ কোন অভিযোগ করেনি। যদি অভিযোগ করে তাহলে খদিয়ে দেখা হবে।