নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

রমজানের শেষ দশ দিন মক্কা-মদিনায় : ওমরাহ, ইবাদত ও জিয়ারায় এক অনন্য আত্মিক যাত্রা

রেহানা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ১৮:০৪, ১৯ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৮:০৬, ১৯ মার্চ ২০২৬

রমজানের শেষ দশ দিন মক্কা-মদিনায় : ওমরাহ, ইবাদত ও জিয়ারায় এক অনন্য আত্মিক যাত্রা

মক্কা, সৌদি আরব! পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশ দিন মক্কা নগরীতে কাটানোর সৌভাগ্য অর্জন আমার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই সফর ছিল কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ছিল আত্মশুদ্ধি, ইমানের দৃঢ়তা এবং ইসলামের ইতিহাসকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার এক বাস্তব পাঠ। পবিত্র এই সফরে আমার মাহরাম পুরুষ হিসেবে সাথে ছিলেন
আমার জীবনসঙ্গী।

মদিনায় অবস্থান ঃ শান্তি ও শ্রদ্ধার নগরী মদিনা। রমজানের শেষের দশ দিন শুরু হওয়ার পূর্বে আমি মদিনা নগরীতে যাত্রা করি। সেখানে মসজিদে নববী-তে নামাজ আদায় এবং রওজা মোবারক-এ সালাম পেশ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। এই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শী। মদিনার পরিবেশে এক ধরনের প্রশান্তি বিরাজ করে, যা মক্কার ব্যস্ততার তুলনায় ভিন্ন এক অনুভূতি প্রদান করে।

মদিনায় অবস্থানকালে আমি উহুদ পাহাড়, কুবা মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান জিয়ারত করি। এসব স্থান ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন বহন করে যা আমার জ্ঞান ও উপলব্ধিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ওমরাহ আদায় ঃ সফর সূচী অনুযায়ী মদীনা থেকে মক্কা পৌঁছানোর পরপরই আমি পবিত্র ওমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদুল হারাম-এ উপস্থিত হই। কাবা শরীফ-এর প্রথম দর্শনেই হৃদয়ে এক গভীর আবেগের সঞ্চার হয় যদিও এর পূর্বে আরো দুবার মহান রবের পবিত্র ঘরের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার কিন্তু প্রতিবারই প্রথম বার কাবা ঘর দেখার অনুমতি অন‍্যরকম।এরপর নিয়ম অনুযায়ী তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করি।

ইবাদতের প্রতিটি ধাপে ছিল এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শেষ দশকের ইবাদত ও লাইলাতুল কদরের সন্ধান রমজানের শেষ দশ দিনজুড়ে মসজিদুল হারাম-এ নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় সময় অতিবাহিত করি। বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর-এর সন্ধানে দীর্ঘ সময় ইবাদতে নিমগ্ন ছিলাম। লক্ষাধিক মুসল্লি একসাথে ইবাদতের দৃশ্য এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমে এক ব্যস্ত প্রশান্তিময় সময়সূচি পার করেছি।

চারপাশে লক্ষ লক্ষ মুসল্লির একসাথে ইবাদতে মগ্ন হওয়ার দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব। মনে হচ্ছিল, পুরো পৃথিবী যেন এক বিন্দুতে এসে আল্লাহর দরবারে নতজানু হয়েছে। আমি একাধিকবার তাওয়াফ সম্পন্ন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। প্রতিবার কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করার সময় হৃদয়ে এক অনন্য অনুভূতি জাগ্রত হয়েছে।

একই সাথে আমি সাঈ (সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মাঝে চলাচল) সম্পন্ন করেছি, যা হযরত হাজেরা (আ.)-এর ত্যাগ ও ধৈর্যের স্মৃতিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। এই সময়ে ইফতার ও সেহরির অভিজ্ঞতাও ছিল অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। মসজিদুল হারাম-এর প্রাঙ্গণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে একসাথে ইফতার করা ছিল ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। খেজুর, জমজমের পানি এবং সাধারণ খাবার দিয়েই ইফতার সম্পন্ন করলেও এর তৃপ্তি ছিল অসীম।


জিয়ারা ও ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন ঃ মক্কায় অবস্থানকালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান জিয়ারত করার সুযোগ হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিন পাহাড়, যেখানে ইসলামী ঐতিহ্যের নানা ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া আমি তায়েফ সফর করিÑযেখানে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে চরম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক সেই স্থানগুলো পরিদর্শনের মাধ্যমে তাঁর ত্যাগ ও ধৈর্যের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করি।

ঈদুল ফিতর ঃ মক্কায় ঈদুল ফিতর পালন করা এক বিশেষ অনুভূতি। পবিত্র কাবা ঘরে নামাজ পড়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, এবং মুসলিম ভাই-বোনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। রমজানের শেষ প্রান্তে এসে যখন ঈদের চাঁদ দেখা গেল, তখন আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্র অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত হয়।

একদিকে পবিত্র মাসের বিদায়ের কষ্ট, অন্যদিকে ঈদুল ফিতর-এর আগমনের আনন্দ। ঈদের দিন সকালে আমি মসজিদুল হারাম-এ ঈদের নামাজ আদায়
করি। লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার সেই দৃশ্য আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঈদের দিন কাবা শরীফ-এর পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিÑএই মহান সুযোগ দান করার জন্য। চারপাশে মানুষের হাসিমাখা মুখ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

ঈদের নামাজ শেষে, আমি কাবা ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করি, এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে,ক্ষমা প্রার্থনা করে দুআ করি। সব মিলিয়ে, এই সফর ছিল ইবাদত, ইতিহাস ও আত্মিক উপলব্ধির এক অনন্য সমন্বয়। ওমরাহ আদায়, মক্কা ও মদিনায় ইবাদত, এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানে 
জিয়ারতÑএসব অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এক স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। এই যাত্রা আমাকে আত্মশুদ্ধির পথ দেখিয়েছে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে
আরও দৃঢ় করেছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে মক্কায় ঈদুল ফিতর পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক পরিচিতি :
রেহানা ফেরদৌসী
সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন