নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

শংকর সাহার দ্বৈত রূপ, ক্ষুব্ধ নারায়ণগঞ্জ সনাতন সম্প্রদায়

পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২১:২৪, ৩১ মার্চ ২০২৬

শংকর সাহার দ্বৈত রূপ, ক্ষুব্ধ নারায়ণগঞ্জ সনাতন সম্প্রদায়

নারায়ণগঞ্জের সনাতন সম্প্রদায়ের তথাকথিত নেতা শংকর সাহার ডুয়েল পলিটিক্স ফাঁস হয়ে গেছে সকলের কাছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের দোসর বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের পক্ষে পুরোদমে নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়েছেন শংকর সাহা।

কিন্তু চিহ্নিত এই আওয়ামী দোসর নির্বাচনে জয়লাভ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নির্বাচনের পরে খুব সন্তর্পনে ভিড়ে গেছেন নারায়ণগঞ্জ ৫ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট আবুল কালাম শিবিরে। শংকর সাহার এই দ্বৈত রূপে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের এক সময়ের চিহ্নিত গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গণহত্যা মামলার জেলখাটা আসামি মাকসুদ হোসেনের সাথে সনাতন সম্প্রদায়ের কথিত নেতা শংকর সাহা, বাপ্পী রায় চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজনের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ মিলেছে ইতিপূর্বেই। 

বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় স্বৈরাচারের দোসর মাকসুদ চেয়ারম্যানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি শংকর সাহাকে। নির্বাচনের কিছুদিন আগে মাকসুদ হোসেনকে সাথে নিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন শংকর সাহা এবং সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলো। 

এরপর থেকে তা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে সনাতলীদের মাঝে সমালোচনার ঝড়। ক্ষুব্ধ সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজন জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি করে গণহত্যা চালানো ওসমান পরিবার ও তার দোসরদের সাথে শকর শংকর সাহার এই সখ্যতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। 

তবে সুযোগ সন্ধানী এবং সুবিধাবাদী শংকর সাহা যখন দেখলেন আওয়ামী দোসর মাকসুদ হোসেন নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ব্যর্থ হয়েছেন তখন সুকৌশলে পাড়ি জমান বর্তমানে এমপি আবুল কালাম বলয়ে। অতি সম্প্রতি শেষ হওয়া মহাতীর্থ লাঙলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসবে শংকর সাহাকে দেখা গেছে এমপি কন্যা শামসুন্নুর বাঁধনের সার্বক্ষণিক সঙ্গি হিসাবে। এতে করে শংকর সাহার ডুয়েল পলিটিক্স সকলের সামনে ফাঁস হয়ে গেছে।

অনুসন্ধান বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সভাপতি শংকর সাহা শুরু থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের ১৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ছিলেন সহ-সভাপতি। 

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন এই হিন্দু নেতা। তাকে জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইডির পাশে যেমন দেখা যেতো আবার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সাংসদ সেলিম ওসমানের পাশেও দেখা মিলেছে শঙ্কর সাহার। নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য সকল পক্ষেই ব্যালেন্স করে চলতে দেখা গেছে তাকে। 

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথেই পুরো ৩৬০ ডিগ্রী ইউটার্ন করেন শংকর সাহা। আওয়ামী লীগ নেতা থেকে ধীরে ধীরে বিএনপিতে ঘেষতে থাকেন তিনি। 

সনাতন সম্প্রদায় স্বঘোষিত বিএনপি নেতা জয় কে রায় চৌধুরী বাপ্পির সাথে সারাক্ষণ উঠবসা করতে থাকেন এবং নিজেকে বিএনপি প্রমানের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। যদিও ৫ আগস্টের পূর্বে তাদের কাউকেই বিএনপি’র কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। 

দেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আগে নারায়ণগঞ্জে সনাতন সম্প্রদায়ের সকলে একই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন ছিল না কিন্তু ৫ আগস্টের পর শুরু হয় নতুন বিভক্তি। এ সময়ে বিএনপিপন্থী সনাতনী কিছু সংগঠনের আবির্ভাব ঘটে। নারায়ণগঞ্জে এসব সংগঠনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদেরকে ইতিপূর্বে বিএনপি’র কোনো কর্মসূচিতে দেখা মিলেনি।

কোনো মামলা হামলার স্বীকারও হননি কিন্তু তারা ৫ আগস্টের পর বিএনপির পরিচয়ে সনাতন সম্প্রদায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে থাকেন। সেই নব্য বিএনপি সাজা গোষ্ঠীর সাথে নিয়মিত উঠাবসা করতে থাকেন সুচতুর শংকর সাহা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ১৫ মার্চ তারিখে বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় অনুষ্ঠান করে আত্মপ্রকাশ ঘটে মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব উদযাপন ফ্রন্টের। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়কে আহবায়ক এবং জয় কে রায় চৌধুরী বাপ্পিকে সদস্য সচিব করে ৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা হয় সেই অনুষ্ঠানে।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কাওসার আশা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই কমিটি ঘোষণা করেন।  এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা শংকর সাহা। এই কমিটি ঐতিহ্যবাহী লাঙলবন্দ অষ্টমী স্নান আয়োজনের সহ আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পায়।

কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার প্রথমেই বিতর্কের সৃষ্টি করে স্নান উদযাপন ফ্রন্ট । স্নান চলাকালীন সময়ে উদযাপন ফ্রন্টের একটি পোস্টার সকলের নজরে আসে। সেই পোস্টারে খুনি ওসমান পরিবারের দোসর এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতা হত্যা মামলার আসামি  মাকসুদ হোসেনের ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানো হয়েছে লাঙ্গলবন্দ স্নানে আগত পুণ্যার্থীরের শুভেচ্ছা জানিয়ে আর তাতে লেখা ছিলো নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য পদ প্রার্থী। এই পোস্টারের নিচে লেখা ছিলো প্রচারে মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ অষ্টমী স্নান উৎসব উদযাপন ফ্রন্ট।

গণহত্যা মামলার আসামির ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানোয় উদযাপন ফ্রন্টের উপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলো বন্দরবাসী। অনেকের সাথে কথা বললে তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর বন্দরের মানুষের উপর জুলুম নির্যাতন চালানো মাকসুদ চেয়ারম্যানের ছবি দিয়ে পোস্টার ছাপানো হয়েছে সেই সংগঠনের পক্ষ থেকে যেই সংগঠনের প্রধান একজন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেত্রী। এটা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। 

 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন