নারায়ণগঞ্জ  মঙ্গলবার   ১৩ অক্টোবর ২০২৬

হেলিকপ্টার থেকে গুলি, ৭ মামলা ও কারাবাস

ছাত্রদল নেতা ইরফানের মুখে জুলাই বিপ্লবের রোমহর্ষক স্মৃতি

পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ২০:৩৮, ১৯ জুলাই ২০২৬

ছাত্রদল নেতা ইরফানের মুখে জুলাই বিপ্লবের রোমহর্ষক স্মৃতি

বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন তিনি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে বুকে লালন করেছিলেন দেশের এক কাঙ্খিত পরিবর্তনের স্বপ্ন। সেদিনের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও শিউরে ওঠেন সিদ্ধিরগঞ্জ ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও মহানগর ছাত্রদলের সাবেক স্কুল বিষয়ক সম্পাদক ইরফান ভূঁইয়া।

রোববার (১৯ জুলাই) সকালে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে ফ্যাসিবাদের পতন ও জুলাই বিপ্লবের সেই ভয়ংকর কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর কথা তোলে ধরেছেন তিনি।

ইরফান ভূঁইয়ার ভাষ্যমতে, স্বৈরাচারের পুলিশ বাহিনী সেদিন নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে একটি বুলেট তার শরীরও ঝাঁঝরা করে দিতে পারত, কিন্তু অলৌকিকভাবে তিনি সেদিন বেঁচে যান। তিনি বিশ্বাস করেন, সেদিন ছাত্র-জনতা নিজেদের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে রাজপথে নেমেছিল বলেই আজ বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হতে পেরেছে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই সাহসী ছাত্রনেতা জানান, তাদের আন্দোলন মূলত গতি পায় ১৭ জুলাই থেকে। সেদিন হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সাথে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেন। শুরুতে আন্দোলনটি শান্ত নদীর মতো চললেও ১৮ ও ১৯ জুলাই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ বাহিনী অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়। তাদের নৃশংস হামলায় সেদিন শতাধিক ছাত্র-জনতা আহত হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১৯ জুলাই, শুক্রবার। সকাল থেকেই মহাসড়ক ও এর আশেপাশের অলিগলিতে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে তাদের তুমুল সংঘর্ষ বাঁধে। গডফাদার শামীম ওসমানের গাড়ি বহরের মহড়া এবং তার অনুসারীদের অস্ত্র হাতে তাণ্ডবের পাশাপাশি উপর থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হতে থাকে।

বিষাক্ত গ্যাসে যখন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, হাত-মুখ জ্বলে যাচ্ছিল, তখন সহযোদ্ধাদের এনে দেওয়া ভেজা টিস্যু মুখে চেপে ধরে কিছুটা স্বস্তি পান ইরফান। এরপর আবার লড়াইয়ে ফেরেন। বিকেলের দিকে শিমরাইল পুলিশ ক্যাম্প থেকে নির্বিচারে গুলি চালানো হলে বহু মানুষ হতাহত হন, কিন্তু বুলেটও সেদিন তাদের রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি।

আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে পরবর্তীতে ইরফানের বিরুদ্ধে ৪টি মামলা দেওয়া হয়। মামলার বোঝা মাথায় নিয়েও তিনি মাঠ ছাড়েননি। তবে ২৮ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জের বার্মাস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সহযোদ্ধা মো: গণি মিয়া ও শাকিলসহ তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

গুম বা ক্রসফায়ারের চরম আতঙ্ক গ্রাস করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আদালতে চালান করে জেলখানায় পাঠানো হয়। সেখানে বন্দি থাকা অবস্থায় আরও ৩টি মামলার আসামি করা হয় তাকে।

অবশেষে কারাবাসের অষ্টম দিনে আসে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। ৫ আগস্ট কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে বসেই তিনি পান ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয়ের খবর। মুহূর্তের মধ্যে মনের সব ক্লান্তি ও বন্দিশালার বন্দিত্বের গ্লানি দূর হয়ে যায় তার। মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য। পরদিন, অর্থাৎ ৬ আগস্ট জামিনে মুক্তি পান তারা।

ইরফান ভূঁইয়া কৃতজ্ঞতা ও স্বস্তির সুরে বলেন, ৫ আগস্ট যদি দেশের এই পটপরিবর্তন না হতো, তবে হয়তো বছরের পর বছর তাদের কারাগারেই পচতে হতো, আর কখনো জামিন মিলত না। স্বৈরাচারমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন সত্যি করায় এই আন্দোলনে শহীদ ও আহত হওয়া সকল বীর ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এই ছাত্রনেতা।

 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন