শিরোনাম:
পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ১৫:০৩, ৩১ আগস্ট ২০২৬
সেই বৃটিশ আমল থেকেই নারায়ণগঞ্জ পাট শিল্পের ঐতিহ্যসহ ব্যবসায়িক হাব এর সুনাম হিসেবে প্রাচ্যের ড্যান্ডি খ্যাতি অর্জন করে। যার সুফল এখনও পেয়ে যাচ্ছে পুরো বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের পাইকারী বাজার, শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রগতিতে আধুনিক গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, ডাইং-প্রিন্টিং সহ বহুমাত্রিক শিল্পে সমৃদ্ধতা অর্জন করে নারায়ণগঞ্জ।
যার ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ জীবিকার তাগিদে এখানে এসে জড়ো হয়। ফলে এই নারায়ণগঞ্জ আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুল রপ্তানি আয় ও জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৮ শতাংশ অবদানের কারণে নারায়ণগঞ্জ অর্থনৈতিক সক্ষমতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলাগুলোর তালিকার প্রথম সারিতে অবস্থান করে নিয়েছে।
দেশের ভূমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে যে উৎস কর প্রদান করা হয় তারমধ্যে সর্বোচ্চ কর প্রদানের তালিকায় থাকা চারটি জেলার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের নাম অন্তর্ভূক্ত।
যার ফলে অন্যান্য জেলার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কর প্রদানে জমি রেজিস্ট্রেশন করতে হয় নারায়ণগঞ্জবাসীকে। দেশের উন্নয়নে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অবদানের সুফল ভোগ করলেও এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত জেলা হিসেবেও দুর্নাম রয়েছে নারায়ণগঞ্জের। যেখানে ছোট্ট এই জেলায় বিশাল লোকের সমাগম। যেখানে প্রায় ৭০ লাখ লোকের বসবাস ও কর্মসংস্থান।
যেখানে দেশের বৃহত্তর শিল্প-কারখানার অবস্থান। অথচ সেখানে নেই কোন প্রথম শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা মেডিকেল কলেজ। যোগাযোগ ব্যবস্থার মানও যাচ্ছে-তাই। অথচ এখানকার জনপ্রতিনিধিরা প্রত্যেকেই সব সময় নারায়ণগঞ্জবাসীকে বোকা বানিয়ে উন্নয়ন উন্নয়ন স্লোগান দিয়ে একদিকে তাদের নিজেদের পকেট ভারি করেছেন, অন্যদিকে সেই টাকা দিয়ে বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে নিজেদের গডফাদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জ এখনও ‘বি’ ক্যাটাগরির তালিকায় আছে। যা নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য খুবই কষ্টকর। দেশের অর্থনীতিতে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখার মতো সহজ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই জেলাকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রেখে এখানকার উন্নয়নে তুলনামূলক কম বরাদ্দের সুযোগ দিয়ে এখানকার অবকাঠামোগুলোকে দুর্বল করে রাখা খুবই অপরিকল্পিত বলে নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করেন।
কারণ, নারায়ণগঞ্জ জেলা যেখানে জিডিপি প্রদানে, রপ্তানীতে ‘এ’ ক্যাটাগরির ভূমিকায় আছে সেখানে প্রশাসনিকভাবে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে থাকাটাকে উন্নয়নের বৈষম্য হিসেবেই মনে করেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকারের সময় এখানকার শিল্পাঞ্চলখ্যাত এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় পরিমাণে এবং ব্যবহারের উপযোগী বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, শহরের যানজট নিরসনের চেষ্টা, যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে রাস্তা মেরামত করা, নিরাপদ চলাচলের জন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা, প্রয়োজনীয় ফ্লাইওভার কিংবা উড়ন্ত সড়ক নির্মাণ করা, যোগাযোগের প্রয়োজন অনুযায়ী শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ করা, এসব উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা নোংরা রাজনীতি করে গেলেও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
তাদের মতে কোন জনপ্রতিনিধিই নারায়ণগঞ্জ এর চাহিদা, প্রয়োজনীয়তা এবং জাতীয় স্বার্থে এর গুরুত্ব সম্পর্কে সরকারকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছে কিংবা তারা নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছে করেই বিষয়টাকে এড়িয়ে গেছেন।
তারা যদি বাংলাদেশ সরকারকে বুঝাতে সক্ষম হতেন তাহলে সরকার দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে বিশেষ নজর দিতেন। জাতীয় স্বার্থেই একটি মাস্টারপ্ল্যান করে নারায়ণগঞ্জকে হারিয়ে যাওয়া সেই বাণিজ্য কেন্দ্র বা বিজনেস হাব’র সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারতো।
এর আগে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নারায়ণগঞ্জ উন্নয়নের দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও এখানে কেন উন্নয়ন হয়নি এই বিষয়ে বলতে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলাতে যে হারে উন্নয়ন হওয়ার কথা, সে হারে উন্নয়ন হয়নি।
আর এই উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী তারমধ্যে একটি হলো ‘ঠিক মতো চাইতে না পারা’ এবং অন্যটি হলো ‘কোন উন্নয়ন কাজ আসলেই নিজেদের পক্ষ থেকে সেই কাজে বাধা প্রদান করা’। আপনাদের যদি এই দুটি সমস্যা না থাকতো, তাহলে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের চিত্র আজ সারা দেশের মডেল হিসেবে থাকতে পারতো।
এর ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন, বিগত সময়ের যারা জনপ্রতিনিধি ছিলেন তারা হয়তো নারায়ণগঞ্জের বাস্তব চিত্রটাকে সরকারের কাছে ঠিকমতো উপস্থাপন করতে পারেননি কিংবা ইচ্ছেকৃতভাবেই করেননি।
কি কারণে সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। এরপরও আপনাদের এখানে যেসব উন্নয়ন কাজ পাস হয়ে আসে, সেসব উন্নয়নের কাজে বিভিন্ন অজুহাতে আপনাদের লোকই আবার বাধা প্রদান করে।
ফলে সেসব কাজের সবগুলো আর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এর আগে বিগত সরকারের সময় নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হয়েও সাবেক এমপি একেএম সেলিম ওসমানকেও বেশ কয়েকটি জনসভায় দুঃখ প্রকাশ করে বলতে শোনা গেছে, “আমি একটা বিষয় বুঝতে পারি না, নারায়ণগঞ্জের কোন উন্নয়নের কাজ আসলেই কেন যেন তা থমকে যায়।
এখানকার যেকোন উন্নয়নের কাজই হয়তো ধীরগতিতে হয়, না হয় বাধাগ্রস্ত হয়ে আটকে যায়।” এখানে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে।