শিরোনাম:
পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ২১:৩৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে এক সময় যাদের পদচারণায় রাজপথ কাঁপতো, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে শামীম ওসমানদের মতো প্রভাবশালী নেতাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, আজ বিএনপির সেই দুঃদিনের কান্ডারিরা চরম অবহেলার শিকার।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের অগ্নিঝরা দিনগুলো থেকে শুরু করে পরবর্তী দুই দশকের টানা নিপীড়ন সব বাঁধাকে উপেক্ষা করে আপসহীনভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও দলীয় পদ-পদবীতে ঠাঁই হয়নি এই অকুতোভয় সৈনিকদের। পদে না থেকেও সাবেক পরিচয়েই তারা এখনও বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রথম সারিতে রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে অবমূল্যায়নের শিকার এই প্রভাবশালী নেতাদের তালিকায় একদম প্রথম সারিতে রয়েছেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান। বিএনপি সমর্থিত রাজনীতি করার মাশুল হিসেবে জীবনের দীর্ঘ সময় তাকে কারাগারের অন্ধকক্ষে কাটাতে হয়েছে। একের পর এক রাজনৈতিক ও বিতর্কিত মামলায় নির্যাতিত হলেও তিনি কখনোই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করেননি।
পরিস্থিতির শিকার হয়ে একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হলেও বিদেশে বসেই অনুসারীদের সুসংগঠিত রেখে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির প্রতিটি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে মাটির টানে দেশে ফিরে এলে শেখ হাসিনা সরকার তাকে নিস্তার দেয়নি; নতুন মিথ্যা মামলায় আবারও তাকে গ্রেফতার করে বন্দি করে রাখা হয়। চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আইনি লড়াইয়ে একে একে সব মামলা থেকে খালাস পেয়ে কারামুক্ত হন এবং আবারও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তবে কারামুক্তির পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও দল এখনও এই শীর্ষ ত্যাগী নেতাকে উপযুক্ত পদে মূল্যায়ন করেনি। তা সত্ত্বেও দমে না গিয়ে পদ ছাড়াই বিএনপির প্রতিটি কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কর্মসূচিতে বড় জমায়েত নিয়ে রাজপথ উজ্জ্বল রাখছেন জাকির খান।
একই নিয়তির ফিশকার হয়েছেন মহানগর ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাজহারুল ইসলাম জোসেফ। বিএনপির রাজনীতিতে তৃণমূল পর্যায়ে বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও অজানা কোন রহস্যজনক কারণে তাকে দলের স্থানীয় কোন কমিটিতে পদায়ন করা হচ্ছে না। পদায়ন তো দূরের কথা, নিজ দল বিএনপির কর্মসূচি পালন করতে গিয়েও তাকে প্রায়শই অভ্যন্তরীণ নানা বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বর্তমানে তিনি মহানগর যুবদলের অন্যতম নেতা হিসেবে সক্রিয় থাকলে বর্তমান কমিটির একটি অংশ যুবদলের নাম ব্যবহার নিয়ে আপত্তি তোলে।
অভ্যন্তরীণ সেই ক্ষোভের জেরে কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে যুবদলের অংশ নয় বলে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। তবে এই সিদ্ধান্তেও তার রাজনৈতিক গতি থমকে যায়নি। ঝিমিয়ে না পড়ে বরং রাজপথে নিজের রাজনৈতিক সক্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে বিএনপির মূল ধারার কর্মসূচিতে শক্ত ভূমিকা রাখছেন তিনি।
এদিকে, মহানগর যুবদলের সাবেক সফল সভাপতি ও জনপ্রিয় কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকেও এক প্রকার ‘মাইনাস’ করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির চরম দুর্দিনে, যেখানে অনেক নেতা গা ঢাকা দিয়েছিলেন, সেখানে জীবনের মায়া ত্যাগ করে ও দিনরাত রাজপথ দাপিয়ে বেরিয়েছিলেন খোরশেদ।
রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে করোনাকালীন মানবিক কর্মকাণ্ড সব জায়গায় তিনি ছিলেন কর্মীদের নির্ভরতার প্রতীক। বারবার কারাবরণ করেও কখনো দলীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। যুবদলের সবচেয়ে কর্মীবান্ধব ও ‘ক্লিন ইমেজ’ (পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি) রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সার্বজনীন সুনাম রয়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে এমন পরীক্ষিত নেতাকেও কৌশলে দলের মূল কর্মসূচিগুলো থেকে দূরে সরিয়ে বা ‘মাইনাসে’ রাখা হচ্ছে, যা সাধারণ কর্মীদের ক্ষুব্ধ করে তুলছে।
নেতাদের এমন অবমূল্যায়নে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে জেলা ও মহানগর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে। তৃণমূলের একাধিক কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেসব নেতারা জেল-জুলুম সহ্য করে আওয়ামী লীগের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দলকে আজকের অবস্থানে এনেছেন, দল ক্ষমতায় আসার সুবাতাস পেয়ে তাদেরই বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে। জাকির খান, জোসেফ বা খোরশেদ ভাইদের মতো নেতাদের দলে যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে রাজপথের লড়াকু কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়বে।”
বিতর্ক ও অসন্তোষের বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, ”বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে যোগ্য ও ত্যাগী নেতার সংখ্যা অনেক বেশি। আন্দোলন-সংগ্রামে জাকির খান, খোরশেদ কিংবা জোসেফদের অবদান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। দলীয় হাইকমান্ড অবশ্যই সবার ত্যাগ ও রাজপথের অবদান বিবেচনা করে সঠিক সময়ে যোগ্যদের মূল্যায়িত করবেন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উর্বর স্থানে দলকে সুসংগঠিত রাখতে হলে রাজপথের পরীক্ষিত এবং জনসম্পৃক্ত নেতাদের কোনো বিকল্প নেই। জাকির খান বা খোরশেদের মতো নেতাদের যদি মাইনাস করে রাখা হয়, তবে সেটি তৃণমূলের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলবে।
সামনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ত্যাগী নেতাদের রাজপথ থেকে দূরে রাখা দলের জন্য কৌশলী ভুল হতে পারে। দলীয় কোন্দল সামলে শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত রাজপথের প্রকৃত লড়াকু সৈনিকদের যোগ্য পদে বসিয়ে তৃণমূলের আস্থার প্রতিফলন ঘটানো।”